মহানবীর জুব্বা পেয়েছেন যে দরবেশ

কেনান দেশে বাস করতেন তিনি। বয়েচলা ছোট্ট পাথুরে নদী। তার পাশ ঘেঁষে ঘন জঙ্গল। এখানেই দিনভর, রাতভর মাবুদের নাম জব করেন।

কখনও সিজদায় কখনও মোনাজাতে মাবুদের স্মরণে বুক ভাসান। জমিনে মা, ওপরে আল্লাহকে সঙ্গে রেখে কাটে তার জীবন।

কাজের জন্য বেরোন একটু-আধটু। উট চড়িয়ে দুপয়সা কামাই হলে কাজ ক্ষান্ত দেন। এক পয়সা দান করে এক পয়সার খাদ্য কিনে নেন। অন্ধ মা আর ছেলেতে এ দিয়ে বেশ কাটে।

খেয়ে-দেয়ে মা কাঁদেন শুকরিয়ার কান্না। দরবেশ ওয়েজকরুনিও কাঁদেন সঙ্গে। তিনি কাঁদেন যেন জীবন ভর মায়ের সেবা করতে পারেন।

ভোর না হতেই মাকে নাইয়ে-ধুইয়ে আনেন নদী থেকে। যখন কাজ করতে যান কাঁধে তুলে নেন মাকে। একা বনে মা থাকবেন কেন? ওয়েজকরুনি আছে না! তাই ঘাস জমিতে মাকে বসিয়ে পাশেই উট চরান দরবেশ।

দূর থেকে মাকে চোখে চোখে রাখেন। না জানি মার কষ্ট হয়। ছুটে ছুটে এসে নজর বুলিয়ে যান। ওয়েজকরুনির মাতৃ প্রেমে খুশি হয়ে মাবুদ প্রেম নজর দান করেন। মা আর খোদার সাধনা করতে করতে মহানবীর না দেখা প্রেমিক বনে যান তিনি।

এতে তার হৃদয় নদীতে প্রেম জোয়ার বয়ে যায়। বনের চারধারে বাতাস হয়ে পাথুরে নদীর কূলে কূলে ঢেউ হয়ে ছোটাছুটি করে প্রেম।

প্রেম বিভোর ওয়েজকরুনী হেঁটে বেড়ান প্রেমের মরুতে। হাঁটেন ঝুঁকে ঝুঁকে। উট চরানো রাখাল বালকরা খেলার মজায় ঢিল ছোড়ে। শত তালির ছেঁড়া কম্বলে ঢাকা মানুষটিকে পাগল ভাবে মজা করে।

চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রেমের দরবেশ। তার গায়ে ঢিলের আঘাত মায়া আর ফুলের ছোঁয়া দিয়ে যায়। তিনি মিষ্টি করে বলেন- বালকরা শোন। ছোট ছোট ঢিল কুড়িয়ে মার, যাতে রক্ত না বেরোয়।

রক্ত বেরোলে আমার অজু ভেঙে যাবে। দুনিয়াটা প্রেম আর মায়া। বিড়বিড় করে এসব বলতে বলতে মায়ের স্মরণমায়া এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। মায়ের কথা মনে হতেই এক দৌড়ে ছুটে যান বনে।

মহানবীর এই না দেখা প্রেমিক অন্তর প্রেমের ছটায় নবীর দরবেশি জুব্বা অর্জন করেছিলেন। তাবতমানুষের জন্য প্রেম সাগরের মতো বহমান ছিল মহানবীর জীবনধারা।

দূর কেনানের বয়ে চলা পাথুরে নদী প্রেম জোয়ারে মিলল এসে মক্কার মোহাম্মদ (সা.) নামের সাগরে। পৃথিবীতে মাকে যারা ভালোবাসে, মায়ের যারা সেবা করে, তারাই হয় সৌভাগ্যের অধিকারী। মাকে ভালোবেসে ওয়েজকরুনি আল্লাহর সঙ্গ পেয়েছেন। আর পেয়েছেন মহানবীর প্রেম সঙ্গ।

মাবুদ তার বাণীতে বলেছেন- আমি যাকে ইচ্ছা তাকে যা ইচ্ছা তাই দান করি। এমনি এমনিই আমার খুশি মতো দান করি।

আমাদের কি ইচ্ছা করে না মাকে ভালোবেসে মায়ের সেবা করে ওয়েজকরুনির মতো হতে?

ওয়েজকরুনির ক’টি উক্তি-

* যে সবসময় ভালো খাবার খায় আরও চায়।

* যে নিত্যনতুন পোশাক পরিচ্ছদ পরতে চায়, আরও কামনা করে।

* যে সবসময় ধনীর সঙ্গ লাভ করে আরও চায়। দোজখ এমন লোকের খুব কাছে ওঁৎ পেতে থাকে।

* সাধকদের কাছে জেনে প্রেম সাধন কর। মাবুদ রাজি হবেন তোমার আরাধনায়।

* নির্জনতাই প্রেম। ঠোঁটের নির্জনতা নয়, অন্তরের নির্জনতাই বেহেশতি প্রেম।

* উন্নতি অর্জন হয় বিনয়ে। সত্যবাদীরা পুরস্কৃত হয়। গৌরব ছড়ায় সাধনায়।

* ধৈর্য ধরে লাভ করেছি মহত্ত্ব। শান্তি খুঁজে পেয়েছি মাবুদের সাধনায়।

* যা কিছু আত্মার সম্পদ সবই আমি পেয়েছি।

বিখ্যাত সুফি গ্রন্থ তাজকিরাতুল আউলিয়ার ভাব নিয়ে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *