জামায়াত নিয়ে ঐক্যফ্রন্টে টানাপড়েন

জামায়াতে ইসলামীকে ছাড়ার চাপে রয়েছে বিএনপি। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ‘অভাবনীয় বিপর্যয়ের’ পর বিএনপির নতুন নির্বাচনী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকরা জামায়াত ছাড়তে চাপ দিচ্ছে। তবে বিএনপির পুরনো জোট ২০ দলের শরিকরা জামায়াতের প্রতি সহানুভূশীল। উল্টো ঐক্যফ্রন্টের জামায়াত ছাড়ার চাপকে তারা ষড়যন্ত্র মনে করছে। বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট না হলেও জামায়াত ইস্যুতে বিরোধী অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে দলটির নেতৃত্বাধীন দুই জোটে।

ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন শনিবার বলেছেন, নির্বাচনে জামায়াতের ২২ নেতাকে যে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হবে, তা তিনি জানতেন না। জামায়াতের সঙ্গে একই প্রতীকে ভোট করাকে অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, জামায়াত ছাড়তে বিএনপিকে চাপ দেওয়া যেতে পারে। ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলের নেতারা ড. কামালের বক্তব্যের বিরোধিতা না করলেও ২০ দলীয় জোটের শরিকরা একে নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার ষড়যন্ত্র মনে করছেন। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপি জোটের ‘ভরাডুবির’ জন্য জামায়াতকে দায়ী করছে গণফোরাম।

দলটির সূত্রের দাবি, জামায়াত জোটে থাকার কারণেই ভারতসহ বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব রয়েছে এমন শক্তিগুলোর সমর্থন পায়নি ঐক্যফ্রন্ট। ভারত জামায়াতকে নিরাপত্তা হুমকি মনে করে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ‘ভারতবিরোধী’ নীতির জন্য জামায়াতই দায়ী বলে মনে করে ভারত।

গণফোরামের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা সমকালকে বলেন, পুনর্র্নিবাচনের দাবিতে আগামী দিনে ঐক্যফ্রন্ট আন্দোলনে নামলে জামায়াত সঙ্গে থাকলে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সমর্থন পাওয়া যাবে না। জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার কারণেও দেশের অভ্যন্তরে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। তাই জামায়াতকে জোট থেকে বাদ দেওয়া উচিত। তবে এ বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গণফোরামের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা জানিয়েছেন, জামায়াত ইস্যুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কথা হয়েছে। বিএনপি তাদের আশ্বস্ত করেছে, ধীরে ধীরে জামায়াতকে জোট থেকে বাদ দেওয়া হবে। তবে বিএনপির কোনো নেতা এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেননি।

জামায়াত ছাড়তে দেশি-বিদেশি চাপ থাকলেও বিএনপির একাধিক নেতা সমকালকে বলছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম আড়াল করতে জামায়াত ইস্যু সামনে আনা হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে ১৯৯৯ সাল থেকে বিএনপির জোট। ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছে গত বছর। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির জোট রয়েছে, তা জেনেই ঐক্যফ্রন্টে এসেছে শরিক দলগুলো। জামায়াত ঐক্যফ্রন্টের নয়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক। তাই এ নিয়ে বিতর্ক অহেতুক।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য সমকালকে বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোট আদর্শিক নয়, আন্দোলন ও ভোটের জোট। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যারাই এগিয়ে আসবেন, তাদেরই তারা স্বাগত জানাবেন। কে ডান, কে বাম- তা বিবেচনায় না রেখে জনগণের ভোটাধিকার আদায়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে- এ নীতিতে বিশ্বাসী বিএনপি।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান সমকালকে বলেছেন, ড. কামাল হোসেন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হলেও জামায়াত ইস্যুতে তার সঙ্গে দ্বিমত রয়েছে। জামায়াতের মতো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল অনেক দেশেই রয়েছে। তারা দেশের স্বার্থে রাজনীতি করেন। জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকার জন্য দলটির সব নেতাকে একাকার করা ঠিক হবে না। যুদ্ধাপরাধীর মতো ঘৃণিত ব্যক্তি বিএনপি, আওয়ামী লীগেও থাকতে পারে; যা ব্যক্তির অপরাধ।

জামায়াতের সঙ্গে জোটে সমস্যা না থাকলেও দলটির সঙ্গে আগামী দিনগুলোয় বিএনপির সম্পর্ক কেমন হবে- তা নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। জামায়াত ছাড়তে বিএনপির ওপর যেমন শরিকদের চাপ রয়েছে, ২০ দলীয় জোট ছাড়তে চাপ রয়েছে জামায়াতের তৃণমূলেরও।

দলটির একজন জেলা আমির ও দু’জন উপজেলা আমির সমকালের কাছে দাবি করেন, শুধু বিএনপির সঙ্গে জোটের কারণে গত ১০ বছর তারা সরকারের অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাদের নেতাকর্মীরা বাড়িতে থাকতে পারেন না। গত ১০ বছরে চার শতাধিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। গ্রেফতার হয়েছেন দুই লাখের অধিক। তাদের বিরুদ্ধ মামলা হয়েছে অন্তত ২৫ হাজার। ২০১৩ ও ২০১৫ সালের আন্দোলনে বিএনপির পাশে জামায়াত ছাড়া আর কেউ দাঁড়ায়নি। এত ‘ত্যাগ’ স্বীকারের পরও বিএনপির কাছ থেকে তারা মূল্যায়ন পাননি।

ধরপাকড়ের হাত থেকে নেতাকর্মীদের বাঁচাতে বিএনপির জোট ছাড়া উচিত বলে মনে করেন জামায়াতের তৃণমূলের ওই তিন নেতা। তারা সমকালকে বলেন, বিএনপির সঙ্গে টানা ২০ বছর জোটে থাকায় দলীয় রাজনীতিরও ক্ষতি হয়েছে। শিবিরের সাবেক একজন সভাপতি, যিনি জামায়াতের পদে না থাকলেও দলটির চিন্তাশীল অংশের নেতা হিসেবে পরিচিত, তিনি তৃণমূলের জোট ছাড়ার দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ভোট শেষ হলেও তৃণমূলের কর্মীরা এখনও বাড়িঘরে থাকতে পারছেন না। কেন্দ্রীয় নেতারা সবাই আত্মগোপনে। সরকারের রোষানল থেকে বাঁচতে জোট ছাড়া একটি ভালো পথ।

তাহলে জামায়াত কেন জোট ছাড়ছে না? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, জোট ভাঙার দায় জামায়াত নেতারা নিতে চান না। জামায়াত নিজে থেকে জোট ছাড়লেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের গুজব তৈরি করবে, যা জামায়াতের রাজনীতি শেষ করে দিতে পারে।জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এহসানুল মাহবুব জোবায়ের সমকালকে বলেন, বিএনপির সঙ্গে তাদের জোট আন্দোলন ও ভোটের। এখন দেশে আন্দোলনও নেই, ভোটও নেই। কোনো জোটই চিরস্থায়ী নয়। তবে জামায়াত এখনও বিএনপির জোটে আছে। ভবিষ্যতে কী হবে, তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জামায়াতের ২৩ প্রার্থীর কেউ জয়ী হতে পারেননি। জামানত হারিয়েছেন ২০ জন, যাদের ১৮ জনেরই প্রতীক ছিল ধানের শীষ। জামায়াতের নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে বলে দলটি যে দাবি করে, এবারের নির্বাচনে তার প্রতিফল দেখা যায়নি।

ঐক্যফ্রন্ট শরিকরা জামায়াত ছাড়তে চাপ দিলেও ২০ দলীয় জোটের শরিকরা দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল। জোটের একটি শরিক দলের প্রধান সমকালকে বলেন, নির্বাচনের পরপরই জামায়াত ইস্যুতে ড. কামাল হোসেনের বক্তব্য ষড়যন্ত্রের অংশও হতে পারে। যখন দেশের সব বিরোধী রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্য প্রয়োজন, তখন ড. কামালের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর।

২০ দলীয় জোটের শরিক এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম মনে করেন, নির্বাচনের পরপরই জামায়াত ইস্যুতে সরব হওয়া ‘ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র’। তিনি সমকালকে বলেন, জামায়াত আছে জেনেই এলডিপি ২০ দলীয় জোটে যোগ দিয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট শরিকরাও তাই করেছে। সূত্র: সমকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *